রাডার

হেলাল হাফিজ

একটা কিছু করুন।
এভাবে আর কদিন চলে
দিন ফুরালে হাসবে লোকে
দুঃসময়ে আপনি কিছু বলুন
একটা কিছু করুন।

চতুর্দিকে ভালোবাসার দারুণ আকাল
খেলছে সবাই বেসুর-বেতাল
কালো-কঠিন-মর্মান্তিক নষ্ট খেলা,
আত্মঘাতী আবহেলা নগর ও গ্রাম গেরস্থালী
বনভূমি পাখপাখালি সব পোড়াবে,
সময় বড় দ্রুত যাচ্ছে
ভাল্লাগেনা ভাবটা ছেড়ে সত্যি এবার উঠুন
একটা কিছু করুন।

দিন থাকেনা দিন তো যাবেই
প্রেমিক যারা পথ তো পাবেই
একটা কিছু সন্নিকটে, হাত বাড়িয়ে ধরুন
দোহাই লাগে একটা কিছু করুন।

তুই কি আমার দুঃখ হবি?

আনিসুল হক
তুই কি আমার দুঃখ হবি?
এই আমি এক উড়নচণ্ডী আউলা বাউল
রুখো চুলে পথের ধুলো
চোখের নীচে কালো ছায়া।
সেইখানে তুই রাত বিরেতে স্পর্শ দিবি।
তুই কি আমার দুঃখ হবি?

তুই কি আমার শুষ্ক চোখে অশ্রু হবি?
মধ্যরাতে বেজে ওঠা টেলিফোনের ধ্বনি হবি?
তুই কি মার খাঁ খাঁ দুপুর
নির্জনতা ভেঙে দিয়ে
ডাকপিয়নের নিষ্ঠ হাতে
ক্রমাগত নড়তে থাকা দরজাময় কড়া হবি?
একটি নীলাভ এনভেলাপে পুড়ে রাখা
কেমন যেন বিষাদ হবি।

তুই কি আমার শুন্য বুকে
দীর্ঘশ্বাসের বকুল হবি?
নরম হাতের ছোঁয়া হবি?
একটুখানি কষ্ট দিবি।
প্রতীক্ষার এই দীর্ঘ হলুদ বিকেল বেলায়
কথা দিয়েও না রাখা এক কথা হবি?
একটুখানি কষ্ট দিবি।

তুই কি একা আমার হবি?
তুই কি মার একান্ত এক দুঃখ হবি?

এক গ্লাস অন্ধকার

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
এক গ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে বসে আছি ।
শুন্যতার দিকে চোখ, শুন্যতা চোখের ভেতরও--
একগ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে একা বসে আছি ।

বিলুপ্ত বনস্পতির ছায়া, বিলুপ্ত হরিণ ।
মৌসুমি পাখির ঝাঁক পালকের অন্তরালে
তুষার গহন সৌরভ বয়ে আর আনে না এখন ।

দৃশমান প্রযুক্তির জটাজুটে অবরুদ্ধ কাল,
পুর্ণিমার চাঁদ থেকে ঝ'রে পড়ে সোনালি অসুখ ।
ডাক শুনে পেছনে তাকাই__কেউ নেই ।
এক গ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে বসে আছি একা......
সমকালীন সুন্দরীগণ অতিদ্রুত উঠে যাচ্ছে
অভিজাত বেডরুমে,
মুল্যবান আসবাবপত্রের মতন নির্বিকার ।
সভ্যতা তাকিয়ে আছে তাঁর অন্তর্গত ক্ষয়
আর প্রশংসিত পঁচনের দিকে ।

উজ্জলতার দিকে চোখ, চেয়ে আছি--
ডীপ ফ্রিজে হিমায়িত কষ্টের পাশেই প্রলোভন,
অতৃপ্ত শরীরগুলো খুঁজে নিচ্ছে চোরাপথ--সেক্‌সড্রেন ।

রুগ্নতার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা বিলাচ্ছে অপচয়--
মায়াবী আলোর নিচে চমৎকার হৈ চৈ, নীল রক্ত, নীল ছবি

জেগে ওঠে একখণ্ড ধারালো ইস্পাত--চকচকে,
খুলির ভেতর তাঁর নড়াচড়া টের পাই শুধু ।

ইতিমধ্যে ককটেলে ছিন্নভিন্ন পরিচয়, সম্পর্ক, পদবী --
উজ্জ্বলতার ভেতরে ফণা তুলে আর এক ভিন্ন অন্ধকার ।
গ্লাসভর্তি অন্ধকার উল্টে দিই এই অন্ধকারে ।

মিলিত মৃত্যু


নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।
বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো।
অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায়
অনায়াসে সম্মতি দিও না।
কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,
তারা আর কিছুই করে না,
তারা আত্মবিনাশের পথ
পরিস্কার করে।
প্রসঙ্গত, শুভেন্দুর কথা বলা যাক।
শুভেন্দু এবং সুধা কায়মনোবাক্যে এক হতে গিয়েছিল।
তারা বেঁচে নেই।
অথবা মৃন্ময় পাকড়াশি।
মৃন্ময় এবং মায়া নিজেদের মধ্যে কোনো বিভেদ রাখেনি।
তারা বেঁচে নেই।
চিন্তায় একান্নবর্তী হতে গিয়ে কেউই বাঁচে না।
যে যার আপন রঙ্গে বেঁচে থাকা ভাল, এই জেনে-
মিলিত মৃত্যুর থেকে বেঁচে থাকা ভাল, এই জেনে-
তা হলে দ্বিমত হওঁ। আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়।
তা হলে বিক্ষত হও তর্কের পাথরে।
তা হলে শানিত করো বুদ্ধির নখর।
প্রতিবাদ করো।
ঐ দ্যাখো কয়েকটি অতিবাদী স্থির
অভিন্নকল্পনাবুদ্ধি যুবক-যুবতী হেঁটে যায়।
পরস্পরের সব ইচ্ছায় সহজে ওরা দিয়েছে সম্মতি।
ওরা আর তাকাবে না ফিরে!
ওরা একমত হবে, ওরা একমত হবে, ওরা
একমত হতে-হতে কুতুবের সিঁড়ি
বেয়ে উর্ধ্বে উঠে যাবে, লাফ দেবে শূন্যের শরীরে।