স্নান

জয় গোস্বামী
সংকোচে জানাই আজ; একবার মুগ্ধ হতে চাই ।
তাকিয়েছি দূর থেকে। এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি ।
এতদিন সাহস ছিলনা কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার-
আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে...

জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো । 
তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব'লে যে-প্রেমিক
ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান
হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে ।

আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি 
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি ? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?

শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে
এখনো গোপন ক'রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;
সমস্ত যৌবন ধ'রে ব্যাধিঘোর কাটেনি আমার। আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোৎস্নার ধারনা দেব ব'লে
এখনো রাত্রির এই মরুভূমি জাগিয়ে রেখেছি।

দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত-
যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;
সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে
তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার
পৃথিবী দেখুক,এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি
সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ক'রে রেখে
উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায় ।

অবেলায় শঙ্খধ্বনি

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
অতোটা হৃদয় প্রয়োজন নেই,
কিছুটা শরীর কিছুটা মাংস মাধবীও চাই ।
এতোটা গ্রহণ এতো প্রশংসা প্রয়োজন নেই
      কিছুটা আঘাত অবহেলা চাই প্রত্যাখ্যান ।
                    সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয়
জীবন কিছুটা যাতনা শেখায়,
ক্ষুধা ও খরার এই অবেলায়
অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই ।

বুকে ঘৃণা নিয়ে নীলিমার কথা
অনাহারে ভোগা মানুষের ব্যথা
প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই--
করুনাকাতর বিনীত বাহুরা ফিরে যাও ঘরে ।

নষ্ট যুবক ভ্রষ্ট আঁধারে কাঁদো কিছুদিন
কিছুদিন বিষে দহনে দ্বিধায় নিজেকে পোড়াও
না হলে মাটির মমতা তোমাতে হবেনা সুঠাম,
না হলে আঁধার আরো কিছুদিন ভাসাবে তোমাকে ।

অতোটা প্রেমের প্রয়োজন নেই
ভাষাহীন মুখ নিরীহ জীবন
প্রয়োজন নেই--প্রয়োজন নেই

কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত
রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই
চাই কিছু লাল তীব্র আগুন ।

বিষবৃক্ষ ভালোবাসা

রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
তোমার না-থাকা ভালোবেসে কিছু  ভুলকে বেঁধেছি বক্ষে,
কিছু বলো নাই-ভুল বৃক্ষকে অবাধে দিয়েছো বাড়তে ।
তুমি কি জানতে
ওই তরু নয় স্বাস্থ্যপযোগী, তো সেই বিষবৃক্ষ ।
তুমি কি জানতে ওই ভুল বোধ কতোখানি ক্ষতি, নষ্ট !
তাহলে আমার ভুল নির্মাণ-করোনি তা কেন ধ্বংস ?

এটুকু জীবনে এই অপচয়, ভুল পথে এই যাত্রা-
মিছে কষ্টকে ভালোবেসে এই আত্মহনন যজ্ঞে
কেন জল ঢেলে নেভাওনি এর হেমানল-বিষ-অগ্নি ?

না পাওয়াকে যদি পেয়ে যাই তবে না-পাওয়াই হয় সত্য,
গুটিকয় হাতে পাওয়ার নীড়টি থাকে ক্রিতদাস-বন্দী-
আমার প্রাপ্য এই ধোঁয়া -জালে চিরদিন হলো ভ্রষ্ট ।

তুমি বলো নাই এই ত্যাগ হবে কারো স্বার্থের টেক্কা
 সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একজন রবে ব্যর্থ,
তুমি বলো নাই-তুমি বলো নাই অমোঘ নিয়তি মিথ্যে ।


পেতে চাই গ্রাস অঞ্জলি ভরে যা-কিছু আমার প্রাপ্য,
তোমার থাকাকে বুক ভ'রে চাই, না-থাকা কিছুকে চাই না ।